সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কিছু নির্দেশনা জারি করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের প্রকাশিত ডায়েরিতে প্রক্টরিয়াল নীতিমালার আওতায় ‘ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদেরগ জন্য আবশ্যক নির্দেশনা’ শিরোনামে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নির্দেশনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত হয়েছে বলে ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়েরির ১০৭ নম্বর পৃষ্ঠার ৯ নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কারও বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না। পরবর্তী ১০ নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে কিংবা কোনো লেখা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের অসম্মান বা হেয় করা যাবে না। একই সঙ্গে এমন কোনো পোস্ট বা শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এসব নিয়ম অমান্য করলে তা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রক্টরিয়াল নীতিমালা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নির্দেশনাটি সামনে আসার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, এ ধরনের নির্দেশনা তাঁদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার বিন সেলিম বলেন, “স্বয়ং হাসিনার আমলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এইভাবে শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের দুঃসাহস দেখায়নি। যদি মনে করেন এভাবে বাকস্বাধীনতা ঠেকানো যাবে, তবে তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।”
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ ফেসবুক গ্রুপে শিক্ষার্থী নয়ন আহসান ক্যাম্পাসে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ক্যাম্পাসে শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চললেও অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। নিম্নমানের রড, সিমেন্ট এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন তিনি। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এ ধরনের নির্মাণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছেন, দুর্নীতি নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্টের পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন শিশির বলেন, “দুর্নীতি নিয়ে পোস্ট হওয়ার পরপরই কি তড়িঘড়ি করে নিয়মনীতি চালু করা হলো?”
ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ শাবিপ্রবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আজাদ শিকদারও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললে নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। কিন্তু প্রশাসনের নানা ব্যর্থতায় সুনাম ক্ষুণ্ন হয় না এটা কেমন যুক্তি?”
এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিক্রিয়া জানালেও ছাত্রদল শাবিপ্রবি শাখার পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রকাশ্য প্রতিবাদ দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাবিপ্রবি ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মতপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানে অযৌক্তিক কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। আমরা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য মতপ্রকাশের অধিকারের পক্ষে। তবে কোনো বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নেওয়ার আগে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা দায়িত্বশীল রাজনীতির অংশ।”
তিনি আরও বলেন, “যারা গুজব বা অপপ্রচার ছড়াবে, তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করা উচিত। তবে কয়েকজনের কারণে সবার গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হওয়া উচিত নয়।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান বলেন, “গঠনমূলক সমালোচনা করতে কোনো বাধা নেই। বরং ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার কাজের গঠনমূলক সমালোচনাকে উৎসাহিত করি, কারণ এতে ভুল সংশোধনের সুযোগ পাওয়া যায়। শুধু শব্দচয়নে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিধিমালা অনেক আগেই সিন্ডিকেটে পাস হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমি একজন শিক্ষার্থীকে এ কারণে শোকজও করিনি। আইনের অপপ্রয়োগ যেন না হয়, সেটাই নিশ্চিত করা জরুরি। আমার আমলে এসব বিধির অপপ্রয়োগ হবে না বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করতে চাই।”
জৈন্তা বার্তা/আরআর




