প্রতিকী ছবি
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট নগরীতে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ, এমনকি স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা যেন নিত্যদিনের খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। নগরীর ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে তুলনামূলক নির্জন অলিগলি কোথাও যেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। দিন-দুপুরে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীরা পথচারী ও যাত্রীদের টার্গেট করছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে দিন পার করছে।
নগরীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়ে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পাশাপাশি এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নগরীর বাসিন্দারা। অবশ্য পুলিশের দাবি, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশি টহল জোরদারের করা হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কোনোও ঘটনা ঘটলেই পুলিশের তৎপরতা বাড়ে। এরপর কিছুদিন অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এমনকি জেলেও পাঠানো হয়। তবে কিছুদিন পরেই তারা সহজে জামিনে বেরিয়ে আসে। তাঁদের মতে, চিন্থিত অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যে কারণে ছিনতাই রোধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। এ ছাড়া দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার অভাব ও আইনের ফাঁক ফোকরকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত শনিবার নগরীর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছিনতাইয়ের শিকার হোন বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক অহী আলম রেজা। তিনি জানান, তাঁর তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে শাহি ঈদগাহ এলাকায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য আম্বরখানা মোড় থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তিনি ওঠেন। এ সময় আগে থেকে সামনে চালকের পাশে একজন এবং পেছনে আরেকজন যাত্রী ছিলেন। কিছু দূর এগিয়ে চালক আরেকজন যাত্রী পেছনের সিটে তোলেন।
অহী আলম রেজাকে শাহি ঈদগাহ এলাকায় নামানোর আগে ওই যাত্রীবেশী ব্যক্তিরা ছুরি বের করে তাঁর ছেলের গলায় ধরেন। এ সময় ছেলের জীবন রক্ষায় অহী আলম রেজা তাঁর সঙ্গে থাকা প্রায় ২১ হাজার টাকা তাঁদের হাতে তুলে দেন। পরে যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা অহী আলম ও তাঁর ছেলেকে নির্জন জায়গায় নামিয়ে দেন। এ ঘটনায় তিনি বিমানবন্দর থানায় জিডি করেছেন।
এরআগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকা দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে এক নারী যাচ্ছিলেন। তখন তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন। ওই ঘটনার ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেল এসে অটোরিকশাটির গতিরোধ করে। পরে আরও দুটি মোটরসাইকেল যোগ হয়। একটি মোটরসাইকেল থেকে এক যুবক নেমে ওই নারীর কাছ থেকে ব্যাগ টান দেন। ওই নারীর সঙ্গে ব্যাগ নিয়ে টানাটানি হয়। শেষ পর্যন্ত ওই যুবক ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে উঠে এলাকা ত্যাগ করেন। পুলিশ জানায়, ওই নারীর ব্যাগে ১৫ হাজার টাকা, কয়েকটি ব্যাংকের চেক বই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল।
তারও আগে গত ৫ মার্চ সাগরদিঘিরপার এলাকার একটি ছিনতাইয়ের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী হেঁটে যাচ্ছেন। এ সময় মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তি তাঁর গতিরোধ করেন। তাঁদের একজনের হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র, যা দিয়ে ওই নারীকে ভয় দেখানো হয়। অন্যজন তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বাধা দিলে অস্ত্রধারী ব্যক্তি অস্ত্রের উল্টো দিক দিয়ে ওই নারীকে কয়েকবার আঘাত করেন। একপর্যায়ে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে দ্রুত চলে যান। পুলিশ জানায়, ঘটনার শিকার নারী একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তিনি সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী অভিযোগ করেন, ‘ছিনতাইয়ের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে ‘নেগেটিভভাবে’ প্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ব্যক্তিগত কিছু বিরোধের ঘটনাকেও ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে প্রচার দেওয়া হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্লাউড সোর্সড অনলাইন ডেটাবেজের সূচক অনুযায়ী ক্রাইম ইনডেক্স ও সেফটি ইনডেক্স অনুযায়ী সিলেট মহানগর এলাকার জনগণের বসবাসের জন্য অত্যন্ত ভালো পর্যায়ে রয়েছে। এক-দুটি বিচ্ছিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেভাবে বলা হচ্ছে ছিনতাই বেড়েছে, এটা ঠিক নয়। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলে দাবি করেন তিনি।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত মহানগরের ছয় থানায় ২৪ জন ডাকাত, ১৫৭ জন ছিনতাইকারী ও ২৩১ জন চোর গ্রেপ্তার হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৪টি ছিনতাই ও ১৬টি চুরির মামলা হয়েছে। এ ছাড়া মার্চ মাসে ৭টি ছিনতাই ও ১৯টি চুরির মামলা হয়েছে, যা বিগত অন্যান্য মাসের তুলনায় কম। এ ছাড়া নগরে ১০ বছরের অপরাধের কর্মকা- বিবেচনা করে সম্প্রতি ২৬৩ জন ছিনতাইকারীর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ‘অপরাধকে একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা একটি ইউটোপিয়ান ধারণা। বাস্তবিকভাবে এটি সম্ভব নয়। তবে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এনে একটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়।’
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




