ছবি:সংগৃহীত
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্স ও ঐতিহাসিক ডেগে জমা পড়ছে কোটি টাকার বেশি অর্থ। তিন দফায় গণনা করে শুধু নগদ টাকাই পাওয়া গেছে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে মিলেছে স্বর্ণ, রুপা ও ১৯ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা।
বিপুল এই দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় এবার স্থায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর সেটির আলোকে মাজারের দানবাক্স খোলা, অর্থ গণনা, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) প্রায় ৩৪ দিন পর জেলা প্রশাসনের সিলগালা করা মাজারের তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ ও দানবাক্স খুলে টাকা গণনা করা হয়। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া গণনা চলে দিনভর। সন্ধ্যায় গণনা শেষে সাংবাদিকদের কাছে হিসাব তুলে ধরেন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে গঠিত কমিটির সদস্য এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
এ সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তৃতীয় দফায় মিলল ৭০ লাখ
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, শনিবারের গণনায় মোট ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা পাওয়া গেছে। এর বাইরে ২ ভরি ১ রতি স্বর্ণালংকার ও ১ ভরি ২ আনা রুপা পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের ৩১ পাউন্ড ১১ পয়সা, ৩ হাজার ২৪৮ ভারতীয় রুপি, ৬০ পাকিস্তানি রুপি, ৭০ সৌদি রিয়াল, ৮৩ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, ৪ মার্কিন ডলার, ১০০ নেপালি রুপিসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ১৯ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে।
নজরানা হিসেবে মাজারে দেওয়া কিছু গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিও রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তিন দফায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা
নতুন ব্যবস্থাপনায় মাজারের দানবাক্স ও ডেগের অর্থ এর আগে আরও দুই দফায় গণনা করা হয়েছে।
গত ২২ জুন প্রথম দফায় গণনায় পাওয়া যায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা। এরপর ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। সর্বশেষ শনিবার তৃতীয় দফায় পাওয়া গেল ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা।
তিন দফায় নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩৭৪ টাকা। এর বাইরে রয়েছে স্বর্ণ, রুপা ও বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা।
এবার আসছে নতুন নীতিমালা
মাজারের দানবাক্সে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু দানবাক্স খুলে টাকা গণনা নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে গঠিত কমিটি এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে ভবিষ্যতে কখন দানবাক্স খোলা হবে, কারা গণনার সময় উপস্থিত থাকবেন, কীভাবে অর্থের হিসাব সংরক্ষণ করা হবে এবং সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে-এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম থাকবে।
সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর সেই নীতিমালা অনুযায়ীই মাজারের অর্থ গণনা ও ব্যবস্থাপনা করা হবে। এতে দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যেভাবে শুরু হয় নতুন ব্যবস্থাপনা
মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে গত জুনে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের কথা জানান।
এরপর ১৮ জুন মাজারে থাকা পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মাজারে দানের অর্থ রাখার ঐতিহাসিক তিনটি ডেগও সিলগালা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে নেয় সরকার।
এরপর ২৬ জুন সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে ১৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির উদ্যোগেই পরপর তিন দফায় দানবাক্স ও ডেগের অর্থ গণনা করা হয়েছে।
এখন নজর নীতিমালার দিকে
শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে বিপুল পরিমাণ দানের অর্থ জমা পড়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এবার সেই অর্থের গণনা থেকে ব্যবস্থাপনা-সবকিছু একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিন দফায় কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ পাওয়ার পর এখন সবার নজর প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালার দিকে। নীতিমালা কতটা কার্যকর, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয় এবং ভবিষ্যতে মাজারের দানের অর্থ কীভাবে পরিচালিত হয়-তার ওপরই নির্ভর করছে এই উদ্যোগের সফলতা।
জৈন্তা বার্তা / ওয়াদুদ




