ছবি:সংগৃহীত
সিলেট শহর ও আশপাশের এলাকার বন্যা, জলাবদ্ধতা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় সুরমা নদীর তীর প্রতিরক্ষা, পুনঃখনন ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সিলেট সদর উপজেলার কানিশাইলে সুরমা নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কাজের উদ্বোধন করেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। প্রকল্পের আওতায় সুরমা নদীর প্রায় ৫১ কিলোমিটার অংশ ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
উদ্বোধন শেষে আয়োজিত সমাবেশে নদীভাঙন রোধ, নগরীর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, উন্নয়নকাজের মান এবং দেশের বাজার পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সুরমা নদী ও চেঙ্গার খালের ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ তাদের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পানিসম্পদ মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনের মাধ্যমে টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নদীর ভৌগোলিক চিত্র ও ম্যাপ তুলে ধরে তিনি বলেন, নদীভাঙনের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে নদীর তলদেশের পরিবর্তন থেকে শুরু হয়ে তীরে আঘাত হানে। তাই শুধু নদীর পাড় রক্ষা নয়, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং ভাঙন রোধে নদী পুনঃখনন ও তীর প্রতিরক্ষা কাজ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, চলমান পরিকল্পনার আওতায় সুরমা নদীর বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে তীর প্রতিরক্ষা কাজ করা হবে। এর মধ্যে কানিশাইলে ৫৫০ মিটার, মিরেরচকে ৩০০ মিটার, মেন্দিবাগে ৪০০ মিটার, টোকেরবাজারে ৫০০ মিটার এবং মিরেরগাঁওয়ে ৫০০ মিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজ রয়েছে।
এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর ২৩ কিলোমিটার ও বাসিয়া নদীর ২৩ কিলোমিটার পুনঃখনন, সুরমা নদীর ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং শারী-গোয়াইন নদীর নয়াগাঁও ও মেরিন একাডেমি এলাকায় যথাক্রমে ৫০৫ ও ৮০০ মিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
৪,৭০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প
সিলেটের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় সুরমা নদীর দুই তীরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার করে বাঁধ ও সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের চলাচল ও প্রাতঃভ্রমণের সুযোগও বাড়বে।
উন্নয়নকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘নিজের হক আদায়ের ব্যাপারে নিজেকেই সতর্ক ও যত্নবান হতে হবে।’
কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি এলাকায় মসজিদের ইমাম, স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে ‘স্থানীয় তদারকি কমিটি’ গঠনের পরামর্শ দেন তিনি। এ কমিটি নির্মাণকাজের মান ও অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অপরাধের বড় একটি অংশ মাদক ও অনলাইন জুয়াকেন্দ্রিক। মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা গেলে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নগরীর নিরাপত্তায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে নাইট-ভিশন ও ফেসিয়াল রিকগনিশন সুবিধাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন এবং ডিজিটাল ট্রাফিক লাইট সিস্টেম স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ব্যবস্থা সিলেট মহানগর পুলিশ পরিচালনা করবে বলে জানান তিনি।
নদীতীর ও সড়কের গাছ কাটার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় লাগানো গাছ ২০ বছর পার হলে নিয়ম অনুযায়ী কাটার বিধান রয়েছে। তবে সড়ক সম্প্রসারণ বা অন্য কোনো উন্নয়নকাজে যেখানে গাছ কাটা হবে, সেখানে পুনরায় গাছ লাগানো নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক বাজারদর ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষে নতুন শীতকালীন সবজি বাজারে আসার আগ পর্যন্ত সরবরাহ কিছুটা কমে যায়। এর প্রভাব বাজারে পড়ে। তীব্র গরমে হাঁস-মুরগির ডিম উৎপাদন সাময়িক কমে যাওয়া এবং ডিম নষ্ট হওয়ার কারণেও দামে কিছুটা তারতম্য ঘটে।
শীতের আগমন ও সবজির সরবরাহ বাড়লে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এসব মৌসুমি ও কারিগরি কারণ জনগণের কাছে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সুরমা শুধু একটি নদীর নাম নয়। এই নদীর সঙ্গে সিলেটের মানুষের জীবন, জীবিকা, স্মৃতি ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। আবার এই নদীর ভাঙনে অনেক সময় মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও দীর্ঘদিনের স্বপ্ন হারিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ‘সুরমা-কুশিয়ারা নদীর অববাহিকায় উন্নয়ন এবং বন্যা ও সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (১ম পর্যায়)’-এর আওতায় কানিশাইলে সুরমা নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ শুরু হয়েছে।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘এই কাজ শুধু নদীর তীর রক্ষার কাজ নয়; এর সঙ্গে মানুষের ঘরবাড়ি রক্ষা, ভাঙনের আতঙ্ক কমানো এবং আগামী দিনের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরির বিষয়টি জড়িত। পরিকল্পিত ও টেকসইভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করা গেলে কানিশাইলসহ আশপাশের মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা অনেকটাই কমবে বলে আশা করি।’
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমানসহ স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




