ছবি:সংগৃহীত
জৈন্তাপুর উপজেলায় চলতি শীত মৌসুমে আগাম জাতের তরমুজ বিক্রি শুরু হয়েছে। গত দুই মৌসুম পূর্বে দীর্ঘ কয়েকযুগ থেকে অনাবাদি জমি হিসেবে পড়ে থাকা বিন্নাউরার জমি থেকে আগাছা, বিন্নাউরা ও জংলী উদ্ভিদ ধ্বংস করে তা চাষের উপযোগী করে তুলেছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বিশেষ করে রবি মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে উপজেলার প্রধান প্রধান নদীর তীরবর্তী এলাকায় অনাবাদি জমিগুলোকে লক্ষ্য রেখে তরমুজ চাষের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। কারণ নদীতীরবর্তী হওয়ায় শীত মৌসুমের শুরু থেকে সহজে সেচ সুবিধা পাওয়া যায়।
জৈন্তাপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে গতবারের তুলনায় তরমুজ বেশি আবাদ করা হয়েছে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে। চলতি মৌসুমে গোটা উপজেলাজুড়ে ২৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত মৌসুমে ছিল ১৩০ হেক্টর। গত মৌসুমে তরমুজের আগাম ফলন বাম্পার হওয়ায় চলতি মৌসুমে আরও ১২০ হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত তরমুজ চাষ করা হয়েছে।
নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম সপ্তাহ থেকে তরমুজ বাজারজাত শুরু হয়েছে। কনকনে শীতের এই সময়ে শিলাবৃষ্টির কোনো শঙ্কা না থাকায় এবার তরমুজের বাম্পার ফলন হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর, জৈন্তাপুর ইউনিয়নে ৬৫ হেক্টর, চারিকাঠা ইউনিয়নে ৪৫ হেক্টর, দরবস্ত ইউনিয়নে ৫৫ হেক্টর, ফতেহপুর ইউনিয়নে ২০ হেক্টর ও চারিকাঠা ইউনিয়নে ১৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। গেল বছরের অক্টোবর মাসে রোপণ শুরু হওয়া এই তরমুজ জানুয়ারি থেকে বাজারজাত শুরু হয়েছে এবং চলবে আগামী তিন মাস। এ বছর জৈন্তাপুর উপজেলায় মোট ৮৫০ জন কৃষক তরমুজ চাষ করেছেন। তার মধ্যে প্রদর্শনীপ্রাপ্ত কৃষকের সংখ্যা ১৪০ জন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরও জানায়, আগাম তরমুজ বাজারজাত হওয়ায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। তা ছাড়া আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে থাকবে তরমুজের ভরা মৌসুম। সে সময় তরমুজের চাহিদা থাকে বেশি। চলতি মৌসুমে তরমুজের উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে এই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বর্তমানে আগাম ফলন হিসেবে বাগান থেকে ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে তরমুজ কিনছেন পাইকাররা। সে অনুযায়ী আগামী তিন মাসে দাম বৃদ্ধি-হ্রাস সাপেক্ষে প্রায় ৩০ কোটি ২০ লক্ষ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এ বছর প্রদর্শনীপ্রাপ্ত কৃষকরা বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক পেয়েছেন। তা ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত জাত বাছাই করে তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। যার মধ্যে আনারকলি, পাকিজা, বøাকজায়ান্ট ও গেøারি অন্যতম।
উপজেলার সর্ববৃহৎ কৃষিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ৪নং দরবস্ত ইউনিয়নের সরুফৌদ গ্রামের তরমুজ চাষি লোকমান হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ১২ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এর মধ্যে ২ বিঘা অংশে কৃষি অফিস থেকে তাকে প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে চারা রোপণ করেন তিনি। পার্শ্ববর্তী নদী থেকে ইলেকট্রিক সেচ যন্ত্রের মাধ্যমে পানি দিয়ে পরিচর্যা করেন। আগামী ফেব্রæয়ারির শুরুতে ফসল বিক্রি ও বাজারজাত শুরু করবেন। এখন পর্যন্ত ১২ বিঘা জমিতে তার পরিচর্যা ও উৎপাদন বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন লক্ষ টাকা। পুরো ১২ বিঘা জমিজুড়ে থাকা আনারকলি জাতের তরমুজ থেকে তিনি প্রায় ১০ লক্ষ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী।
এদিকে, জানুয়ারি মাসের প্রথম থেকে আগাম রোপণ করা তরমুজ বিক্রি শুরু হয়েছে। জৈন্তাপুর উপজেলার সারীঘাট দক্ষিণ বাজার এলাকায় সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের দুই পাশে সারী নদীর তীরে তরমুজের হাট বসে। সেখানে আলাপ হয় তরমুজ বিক্রেতা উপজেলার বনপাড়া গ্রামের মইনুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, উপজেলার কুচারাই, রামপ্রসাদ ও হেলিরাই এলাকার বাগান থেকে সরাসরি তরমুজ সংগ্রহ করে সারীঘাট দক্ষিণ বাজারে বিক্রি করেন তিনি। মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এই বাজার তরমুজের জন্য প্রসিদ্ধ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার পাইকাররা আসতে শুরু করেছেন। বেশির ভাগ পাইকার ঢাকার কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বিশ্বরোড ও কুমিল্লা জেলার ময়নামতি থেকে আসেন। বর্তমানে রাতে ট্রাক লোড করা হয়। দিনে আবার মাঠ থেকে তরমুজ সংগ্রহ করে মহাসড়কের পাশে স্তুপ করে রাখা হয়।
একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী কুচারাই গ্রামের শরীফ উদ্দিন জানান, তিনি ১০ বছর যাবত তরমুজ ব্যবসায় জড়িত। চলতি মৌসুমে জৈন্তাপুর উপজেলায় আগাম তরমুজের ফলন হওয়ায় আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন মাঠ থেকে তরমুজ সংগ্রহ করে তিনি বিক্রি করবেন। পরে জৈন্তাপুরের তরমুজ শেষ হয়ে গেলে বরিশালসহ দক্ষিণবঙ্গের জেলা থেকে তরমুজ এনে বিক্রি করবেন। বর্তমানে শীতের মাঝামাঝি সময়ে তরমুজ পাওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদা রয়েছে। জাফলং, তামাবিল, শাপলা বিল ও লালাখালে বেড়াতে আসা পর্যটকরা আগাম তরমুজ ক্রয় করেন। প্রতি পিস বড় তরমুজ ২৫০-৩০০ টাকা এবং ছোট আকারের তরমুজ ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহের পূর্বে তাদের অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখতে হয়।
জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ন দিলদার জানান, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে চলতি শীত মৌসুমে তরমুজ চাষিদের মধ্যে প্রদর্শনী প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন যাবৎ অনাবাদি জমিগুলোকে চাষের আওতায় এনে নদী তীরবর্তী জমিগুলোতে তরমুজ আবাদ করে কৃষি উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। আগামী মৌসুমগুলোতে তা আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




