রাস্তার দুপাশে বাস পার্কিং, পাশে পড়ে আছে আধুনিক টার্মিনাল
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ০৯:১৯ PM

কদমতলি এলাকায় যানজটে চরম ভোগান্তি

রাস্তার দুপাশে বাস পার্কিং, পাশে পড়ে আছে আধুনিক টার্মিনাল

প্রকাশিত: ০৭/০৩/২০২৬ ০১:০১:১১ AM

রাস্তার দুপাশে বাস পার্কিং, পাশে পড়ে আছে আধুনিক টার্মিনাল

ছবি: জৈন্তা বার্তা


সিলেট নগরীর কদমতলি বাস টার্মিনাল এলাকায় মূল সড়কের দুই পাশজুড়ে সারিবদ্ধভাবে পার্ক করে রাখা হচ্ছে শতশত যাত্রীবাহী বাস। অথচ ঠিক পাশেই রয়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। কিন্তু টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখার পরিবর্তে চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা সড়কের ওপরই গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখছেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে সারাক্ষণ লেগে থাকছে যানজট এবং চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ও সিলেট-জকিগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে যাতায়াতকারী অধিকাংশ যানবাহনকে কদমতলি এলাকার এই সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হয়। ফলে সড়কের দুইপাশে যত্রতত্র বাস পার্কিংয়ের কারণে প্রায় সারাদিনই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রীদের সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা মানুষজন দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল কালাম বলেন, প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার সময় তাকে এই সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হয়। কিন্তু রাস্তার দুইপাশে বাস পার্কিং করে রাখার কারণে প্রায়ই যানজটে আটকে থাকতে হয়। তিনি বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই এই যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় এত দীর্ঘ যানজট হয় যে গাড়িতে বসে থাকা সম্ভব হয় না। তখন বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়।’

সরেজমিনে কদমতলি বাস টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মূল সড়কের দুইপাশজুড়ে সারিবদ্ধভাবে বাস দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে বাসগুলো এমনভাবে রাখা হয়েছে যে মূল সড়কের অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল হয়ে গেছে। ফলে একসঙ্গে দুই দিক থেকে আসা গাড়ির চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

স্থানীয় যাতায়াতকারীদের অভিযোগ, সড়কের বিশাল অংশ জুড়ে নিয়মিতভাবে বাস পার্কিং করা হচ্ছে। এতে প্রায় সব সময় যানজট লেগে থাকে এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েন।

অন্যদিকে বাসচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, কদমতলি বাস টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এ কারণে তারা সড়কের ওপর বাস রাখতেই বাধ্য হচ্ছেন।

পরিবহন শ্রমিকদের নেতা আলী আকবর রাজন বলেন, টার্মিনাল চালুর পর থেকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যকর তদারকি নেই। টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখার জায়গাও সীমিত।

তিনি বলেন, ‘একেকটি স্পেসে খুব অল্পসংখ্যক বাস রাখা যায়। তাছাড়া টার্মিনালের ইজারাদাররাও তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না। ফলে অনেক অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৮ একর জমির ওপর ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন এই বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট সার্ভিস প্রজেক্ট (এমজিএসপি) প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।

প্রকল্পের আওতায় ডাম্পিং গ্রাউন্ড নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫৬ কোটি টাকা এবং টার্মিনালের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হয় প্রায় ৬১ কোটি টাকা। বিমানবন্দরের আদলে নির্মিত এই টার্মিনালে আগমন ও বহির্গমনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাত্রী ওঠানামার জন্য পৃথক ভবন, বিশাল পার্কিং এলাকা, পরিবহনকর্মীদের জন্য আলাদা ভবন, রেস্টুরেন্ট ও ফুড কোর্ট, বিশ্রামাগার, নারী-পুরুষ ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পৃথক শৌচাগার, ব্রেস্ট ফিডিং জোন, স্মোকিং জোন, ছোট দোকান, অসুস্থ যাত্রীদের জন্য সিক বেড এবং প্রার্থনাকক্ষসহ নানা আধুনিক সুবিধা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সভা আয়োজনের জন্য বড় হলরুম এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়ার্কশপও নির্মাণ করা হয়েছে।

টার্মিনালের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে গোলাকার পাঁচতলা একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে টার্মিনাল পরিচালনা কার্যালয়, কন্ট্রোল রুম, পুলিশ কক্ষ এবং পর্যটন তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের কথা ছিল।

টার্মিনালের বহির্গমন ভবনের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৩০০ ফুট। এই অংশে একসঙ্গে ৪৮টি বাস দাঁড়াতে পারে। এছাড়া যাত্রীদের বসার জন্য প্রায় ৯৭০ আসনের বিশাল হলরুম রয়েছে। রয়েছে ৩০ আসনের ভিআইপি কক্ষ এবং ৩০টি টিকিট কাউন্টার। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী পরীক্ষামূলকভাবে টার্মিনালটির কার্যক্রম চালু করেন। কিন্তু চালুর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই টার্মিনালটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক অবকাঠামো ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যাত্রীদের বসার জন্য রাখা অনেক চেয়ার ভেঙে গেছে। কিছু চেয়ার আবার চুরি হয়ে গেছে। দামি চেয়ারগুলোতে জং ধরেছে। টার্মিনালের লাইট ও সিলিং ফ্যান খসে পড়তে শুরু করেছে।

বাথরুমের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক জায়গায় দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ওয়াচ টাওয়ারটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

ভিআইপি যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বসার স্থান এবং নামাজের কক্ষেও অযতেœর ছাপ স্পষ্ট। সেখানে মাকড়সার জাল পড়ে আছে। অনেক জায়গায় কাচের গ্লাসে পরিবহন নেতাদের নির্বাচনী লিফলেট লাগানো দেখা গেছে।

স্থাপত্য নকশার দিক থেকেও সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি বিশেষভাবে পরিচিত। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি এবং আসাম প্যাটার্নের বাংলোর স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে এই টার্মিনালটির নকশা তৈরি করা হয়েছে। নান্দনিক এই স্থাপত্যের কারণে অনেকেই এটিকে দেশের অন্যতম সুন্দর বাস টার্মিনাল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাটি এখন ধীরে ধীরে অবহেলার শিকার হচ্ছে।

টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইজারাদার মো. মিজানুল ইসলাম জানান, তিনি এক বছরের জন্য ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকায় টার্মিনালের যানবাহন ও কাউন্টার থেকে টোল আদায়ের ইজারা নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রত্যাশিত সংখ্যক বাস টার্মিনালে প্রবেশ না করায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তার মতে, সব বাস যদি নিয়ম অনুযায়ী টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করে তাহলে টার্মিনাল পরিচালনা সহজ হবে এবং যাত্রীদেরও সুবিধা হবে।

অবৈধ বাস পার্কিং উচ্ছেদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদের জন্য অভিযান চালালে প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।

তিনি বলেন, ‘যখনই আমরা এসব পার্কিং উচ্ছেদ করতে যাই, তখন শ্রমিক নেতারা একজোট হয়ে বাধা দেন। অনেক সময় আন্দোলন বা অবরোধের হুমকিও দেওয়া হয়। আবার কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে উচ্চপর্যায় থেকেও তদবির আসে।’

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সুদীপ্ত রায় বলেন, অবৈধ পার্কিংয়ের বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগ সব সময় নিরুৎসাহিত করে। তিনি বলেন, ‘প্রধান সড়কগুলোতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই এবং জরিমানাও করা হয়। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল অভিযান চালিয়ে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, নগরীতে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা বাড়ানো হয়নি। ফলে রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করার প্রবণতা বেড়েছে।

সিটি করপোরেশনের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ভবন নির্মাণ করলে সেখানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নগরীর অনেক মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে সেসব স্থানে রাস্তার ওপরই গাড়ি পার্কিং করা হয়। অন্যদিকে অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানো হয়েছে, যার ফলে পথচারীদের চলাচলের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে কদমতলি বাস টার্মিনাল এলাকার অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ বাস পার্কিংয়ের কারণে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ছেন নগরবাসী।

স্থানীয়দের দাবি, টার্মিনালটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং সড়কের ওপর বাস পার্কিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সহজেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক টার্মিনালটি অকার্যকর থেকে যাবে এবং সড়কের যানজটও দিন দিন বাড়তেই থাকবে।


জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ: