প্রত্যাশার চেয়ে পর্যটক কম : বাড়তি ভাড়া, অব্যবস্থাপনায় অ*সন্তোষ
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ১০:৩৫ AM

২০ শতাংশ হোটেল-মোটেলই খালি

প্রত্যাশার চেয়ে পর্যটক কম : বাড়তি ভাড়া, অব্যবস্থাপনায় অ*সন্তোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪/০৩/২০২৬ ১১:৫৭:৪৩ PM

প্রত্যাশার চেয়ে পর্যটক কম : বাড়তি ভাড়া, অব্যবস্থাপনায় অ*সন্তোষ

ছবি:সংগৃহীত


ঈদের সরকারি ছুটি শেষে গতকাল মঙ্গলবার থেকে অফিস-আদালত ও ব্যাংক-বিমা খুলেছে। তবু এখনও সিলেটে আসছেন পর্যটকরা। ঈদের পর দিন থেকেই দলবেঁধে পর্যটকরা আসছেন সিলেটে।  ২৬ মার্চসহ টানা তিনদিনের ছুটি থাকায় পর্যটক সমাগম আরও বাড়বে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

তবে এবার প্রত্যাশার চেয়ে কম পর্যটক সিলেটে আসছেন বলে জানিয়েছেন সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার্স গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী চৌধুরী জুয়েল। তিনি দাবি করেন, ঈদকে ঘিরে পর্যটকদের সমাগম ঘটেছে ঠিকই; তবে প্রত্যাশার চেয়ে কম। পর্যটকরা সিলেট এলেও তাঁরা সেখানে অবস্থান করছেন না। বেশিরভাগই ঘুরাঘুরির পর গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন। ফলে ঈদের ছুটিতে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট পর্যটকে পরিপূর্ণ হয়নি; ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হোটেল-মোটেলে রুম ফাঁকা ছিলো বলে তিনি জানান।

এদিকে ঈদের দিন বিকেল থেকেই সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। জাফলং, সাদাপাথর, লালাখাল, রাতারগুল, মাধবকু- কিংবা চা-বাগান সব জায়গায়ই পর্যকটদের ভীড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের উপস্থিতি যেমন আনন্দের, তেমনি এটি সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে দেশের সামনে তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বজায় থাকলে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ভবিষ্যতেও এভাবেই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে থাকবে। সম্ভাবনাময় এই পর্যটনস্পটগুলো টিকিয়ে রাখতে সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।

সাদা পাথর: স্বচ্ছ পানির নদী, সাদা পাথর আর পাহাড়ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে সাদাপাথরে ভিড় জমাচ্ছেন হাজারো পর্যটক। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে কেউ নৌকায় ঘুরছেন, কেউ নদীর ঠান্ডা পানিতে নামছেন, আবার কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটক আসায় তাদের ব্যবসায় চাঙাভাব দেখা দিয়েছে। নৌকা ভাড়া, খাবারের দোকান, পার্কিংসহ সংশ্লিষ্ট খাতে আয় বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে কিছুটা বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষকরে গাড়ি পার্কিং ও নৌকা ভাড়া নিয়ে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একাধিক পর্যটক জানান, সাদাপাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাদের মুগ্ধ করেছে। তবে পরিবেশ রক্ষায় আরও সচেতনতা বাড়ানোর দাবি জানান তারা। গত রোববার সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় রয়েছে সেখানে। পার্কিং থেকে শুরু করে স্পটের ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী সকলেই উৎসবের আমেজে রয়েছেন। পর্যটকদের এমন উপস্থিতিতে সকলেই আনন্দ।  পাশাপাশি পর্যটকরাও আনন্দের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এখানে।

ব্যাংকার সানজিদা কবীর জানান, পরিবারের সঙ্গে তিনি ঈদের পরদিন সকালে সিলেটে এসেছেন। সাদাপাথর, রাতারগুল, জাফলং এবং সিলেটের চা-বাগান ঘুরে দেখবেন বলে তিনি জানান।

পুরান ঢাকার কাপড় ব্যবসায়ী রাজিব জানান, সাদাপাথরের পরিবেশ দেখে তিনি মুগ্ধ। বেশ উপভোগ করেছেন। তবে বাড়তি নৌকা ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেন তিনি।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, ‘সাদাপাথরে প্রচুর পর্যটক এসেছেন। তাদের সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করি আগামী দিনগুলোতেও পর্যটকদের আগমন ঘটবে।’

জাফলং: গত সোমবার সরেজমিন জাফলংয়ে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই দলবেঁধে পর্যটকেরা ঘুরতে বের হয়েছেন। মেঘালয়ের পাহাড়, পাথর আর স্বচ্ছ জলের সমাহার দেখে যেন তাঁরা মুগ্ধ হন। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরছেন আর ছবি তুলছেন। কেউ কেউ নৌকা নিয়ে মায়াবি ঝরনা, খাসিয়া পল্লি আর চা-বাগানের উদ্দেশে যাচ্ছেন। নৌকা মাঝি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী, ট্যুর গাইড, ফটোগ্রাফার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য।

সপরিবারে বেড়াতে এসে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। এখানকার পরিবেশ খুব চমৎকার। পাহাড়, পানি আর ঝুলন্ত ব্রিজ দেখলাম। খুব ভালো লাগল।’

রাতারগুল: দেশের একমাত্র মিঠাপানির এই জলাবনেও পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম দেখা গেছে। তবে এখানকার অব্যবস্থাপনা ও নৌকা ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন পর্যটকরা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠছে স্থানীয় নৌচালকদের বিরুদ্ধেও। সোমবার রাতারগুলে গেলে দেখা গেছে, প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপভোগ করছেন দর্শনার্থীরা। গাছপালার ফাঁক দিয়ে দুপুরের রোদ পড়ার অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। নৌকায় ভেসে বনের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতি পর্যটকদের কাছে যেন সবুজের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার মতো। বনের ভেতর ছাতার মতো ডালপালা মেলানো গাছের সারি, পাখির কিচিরমিচির আর শীতল বাতাস-সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক প্রশান্তিময় পরিবেশ।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সাকিব হোসেন জানান, এখানকার পরিবেশ ভিন্ন। বন্ধুদের সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশ উপভোগ করেছেন তিনি। তবে নৌকা ভাড়া কম হলে আরও ভালো লাগতো বলে জানান তিনি।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডের প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, মনে হচ্ছে আফ্রিকার কোনো জঙ্গলে হাঁটছি। তিনি বলেন, শুকনো মৌসুমে বনের ভেতরে যেহেতু হাঁটা যায়, সেজন্য পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য যদি বসার কোনো সুযোগ ব্যবস্থা তাহলে আরও ভালো হতো। তাছাড়া শৌচাগারও নেই। এসব প্রয়োজনীয় কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করলে রাতারগুল আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠবে।

এদিকে ঈদের ছুটিতে সিলেটের সবগুলো স্পটে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উৎপল কুমার চৌধুরী। তিনি জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ টহল জোরদারের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি রয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযোগ বক্স স্থাপনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, পর্যটকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় যেন না হয়, সেসব তদারকির জন্য একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনকে নির্দেশনা দিয়েছি তাঁরাও মাঠে কাজ করছেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ