ছবি:সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাইবার বুলিং ও হেনস্তার অভিযোগে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। একই সঙ্গে তার ভিডিও নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফুর রহমান জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় বিউটি রানী পাল থানায় একটি জিডি করেছেন। জিডিতে ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’সহ কয়েকটি ফেসবুক পেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জিডিতে বিউটি রানী পাল অভিযোগ করেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ তার ভিডিও নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি প্রবাসী আসিফ ইকবাল ইরন ভিডিওটি ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং তার সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিউটি রানী পালের ভাষ্য, ‘উনি আমার ভিডিও ডাউনলোড করে তার পত্রিকায় নিউজ করেছেন এবং ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজেও আমার সম্পর্কে আজেবাজে লিখেছেন।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আসিফ ইকবাল ইরনের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে সোমবার বিকেলে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ জানান, ভিডিওটির বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভিডিওর বিষয়টি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ও বলেছেন, এ ঘটনায় তিনি অন্যায় কিছু দেখছেন না। আমরাও প্রাথমিকভাবে খোঁজখবর নিয়ে ভিডিওতে কোনো অনিয়ম বা অন্যায় পাইনি। তাই এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রয়োজন নেই।’
এর আগে রোববার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল মোল্লা জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২৩ জুলাই বিউটি রানী পাল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি বাংলা গানের সঙ্গে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধারণ করা একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে তাকে পরিপাটি পোশাকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাঁটতে দেখা যায়। এরপর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে একটি অংশের সমালোচনা, ট্রল এবং তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও ওঠে।
বিউটি রানী পাল বলেন, তিনি রিল তৈরি করতে জানতেন না। এক সহকর্মীর সহযোগিতায় স্কুল ছুটির পর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাঁটার সময় ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল।
সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মুখে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন-মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ-তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেব?’ তিনি আরও বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করা গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষকদের সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রণয়নেরও দাবি জানান তিনি।
এ ঘটনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ বিউটি রানী পালের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। অনেকে একই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করে তার প্রতি সমর্থন জানান এবং সাইবার বুলিংয়ের প্রতিবাদ করেন।
রোববার সিলেট সফরে এসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ভিডিওটি দেখেননি। তবে ভিডিওতে কোনো অশ্লীলতা নেই বলে শুনেছেন। ‘গান গাওয়া বা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না,’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্য এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে কোনো অনিয়মের প্রমাণ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভিডিওটি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।
উল্লেখ্য, বিউটি রানী পাল ২০২৬ সালে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের পাঠদান, সহশিক্ষা কার্যক্রম, শরীরচর্চা, নাচ-গানের মাধ্যমে পাঠদান, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আসছেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




