ছবি:সংগৃহীত
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সেনগ্রাম মোহাম্মদিয়া সালাফিয়া দাখিল মাদরাসার এক গণিত শিক্ষক ইউরোপের দেশ ডেনমার্কে অবস্থান করেও সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করছেন-এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মাদরাসাটির গণিত শিক্ষক মাহবুবুর রহমান।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক বছর ধরে তিনি বিদেশে অবস্থান করলেও মাদরাসায় কোনো শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেননি। এরপরও প্রতি মাসে ২৫ হাজার ৪৪ টাকা করে সরকারি বেতন গ্রহণ করেছেন। সেই হিসাবে গত এক বছরে তিনি প্রায় ৩ লাখ ৫২৮ টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসার সুপার ফয়েজুল ইসলামের সহযোগিতায় এ অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বৃহস্পতিবার বিকেলে মাদরাসায় যান কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়া ও ইমজা, সিলেট-এর দুই সাংবাদিক। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসার সুপার উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে মাদরাসা প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়ার সময় কয়েকজন যুবক সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে তিনটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার ভিডিওচিত্র সাংবাদিকদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথমে মাদরাসার সুপার ফয়েজুল ইসলাম দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক চার দিনের ছুটিতে রয়েছেন। তবে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে তিনি পরে বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, শিক্ষক ছয় মাসের ছুটিতে আছেন। একই সময়ে তিনি সাংবাদিকদের আর কোনো প্রশ্ন না করতে বলেন এবং শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের ডাকার নির্দেশ দেন।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যাদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা সততা, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধেই যদি সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের সামনে কী ধরনের বার্তা বহন করবে?
মাদরাসাটির সাবেক শিক্ষার্থী রাহিম আহমদ বলেন, ‘আমরা যখন এ মাদরাসায় পড়াশোনা করেছি, তখন মাহবুবুর রহমান স্যার গণিত পড়াতেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি ডেনমার্কে চলে যান। এরপরও সুপার ও পরিচালনা কমিটির কয়েকজনের সহযোগিতায় তার সরকারি বেতন উত্তোলন করা হচ্ছে বলে শুনেছি। তিনি বিদেশে যাওয়ার পর ভালো গণিত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
অভিভাবক আবু বক্কর আবুল বলেন, ‘এলাকার সবাই জানে শিক্ষক বিদেশে অবস্থান করছেন। এরপরও যদি সরকারি বেতন উত্তোলন হয়ে থাকে, তাহলে তা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম। তিনি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, শিক্ষক ছুটিতে আছেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে বিদেশে অবস্থান করেও সরকারি বেতন উত্তোলনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্ট মাসে মাহবুবুর রহমান ডেনমার্কে যান। অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসার সুপার ফয়েজুল ইসলাম ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইসমাঈল হোসেন শামীমের যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মাদরাসার সভাপতি ইসমাঈল হোসেন শামীম মুঠোফোনে বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এক বছরের ছুটিতে রয়েছেন। তবে এর বেশি কিছু না বলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সার্বিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরবর্তী বিধি মোতাবেক ব্যবস্হা নেয়া হবে।
এদিকে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সুনন্দা রায় বলেন মান্যবর জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা মোতাবেক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রধান করে এবং উপজেলা সমবায় সমবায় কর্মকর্তা ও জৈন্তাপুর দারুস সুন্নাহ্ মাদ্রাসার প্রিন্সিপালকে সদস্য করে মোট ৩ সদস্যের একটি তদন্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহন করা হবে।
অন্যদিকে, সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়ম ও হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




