সিলেটে পাথর লু/টের মহোৎসব, থামাতে পারছে না প্রশাসন
রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০১:১৬ AM

সিলেটে পাথর লু/টের মহোৎসব, থামাতে পারছে না প্রশাসন

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১/০৮/২০২৬ ১১:৪৫:৩৯ PM

সিলেটে পাথর লু/টের মহোৎসব, থামাতে পারছে না প্রশাসন

ছবি:সংগৃহীত


সরকারি নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ আদালতের নির্দেশ এবং একাধিক প্রশাসনিক অভিযানের পরও সিলেটে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। বরং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাফলং, বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, অবকাঠামো এবং পর্যটন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।

বর্তমানে গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং ও বিছানাকান্দি, কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর, শাহ আরেফিন টিলা, উৎমাছড়া ও রেলওয়ে বাংকার এলাকা, কানাইঘাটের লোভাছড়া এবং জৈন্তাপুরের শ্রীপুর, রংপানি ও বড়গাং এলাকায় দিন-রাত অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে। শ্রমিকরা নদীর তলদেশ থেকে পাথর তুলে নৌকায় করে তীরে এনে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন।

ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ খনিজ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিওএমডি) গেজেটভুক্ত সিলেটের আটটি পাথর কোয়ারিতে ২০২০ সাল পর্যন্ত হাতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি ছিল। তবে পরিবেশ রক্ষায় ২০১৪ সালে উচ্চ আদালত যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন। এরপর ২০১৫ সালে জাফলংয়ের ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে সরকার সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে।

পরিবেশবাদীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাফলংসহ বিভিন্ন এলাকায় নজিরবিহীন পাথর লুট শুরু হয়। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় জাফলং থেকেই কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর লুট করা হয়। একইভাবে অল্প সময়ের মধ্যে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর ও বিছানাকান্দির বিস্তীর্ণ এলাকাও পাথরশূন্য হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের ২৬ জুলাই তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘আমি দেখছি, পাথর উত্তোলনের পক্ষে সব দলের ঐকমত্য রয়েছে। চার বছর আন্দোলন করে জাফলংয়ে উত্তোলন বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু উপদেষ্টা হিসেবে তা আর পারছি না।’

পাথর লুটের ঘটনায় প্রশাসনিক পর্যায়েও পরিবর্তন আসে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তর জাফলংয়ে পাথর লুটের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির চার নেতাসহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

পরবর্তী সময়ে, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল পরিবেশ মন্ত্রণালয় জাফলংয়ের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের আটটিসহ দেশের সব ১৭টি পাথর কোয়ারির ইজারা নিষিদ্ধ করে। একই বছরের আগস্টে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর এলাকায় লুটপাটের ঘটনায় বাংলাদেশ খনিজ উন্নয়ন ব্যুরো (বিওএমডি) অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরের মাসে র‍্যাব কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের আগস্টে তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। তবে এখনো তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত সিন্ডিকেটগুলো রাতের অন্ধকার ও ভোরবেলায় অবৈধ উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের পর এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে শুধু নদীর তলদেশ থেকেই নয়, গোয়াইনঘাটের জাফলং সেতু ও কোম্পানীগঞ্জের ধলাই সেতুর পিলারের আশপাশ থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সেতুগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো জৈন্তা রাজ্যের ঐতিহাসিক জাফলং প্যালেসের ভিত্তির নিচ থেকেও পাথর তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের নবসৃষ্ট হাজিপুর-আহারকান্দি বালুমহালে ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ইজারাভুক্ত এলাকার পাশাপাশি লুনী, কইন্না জঙ্গল, উত্তর ও দক্ষিণ প্রতাপপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীর ভাঙন বেড়েছে। ফসলি জমি, বসতভিটা, চা-বাগান ও খেলার মাঠ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে ইজারার বাইরে ব্যবহৃত ড্রেজার ও বোমা মেশিন ধ্বংস করলেও ইজারাভুক্ত এলাকায় চলমান ড্রেজার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বাংলাদেশ খনিজ উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। অভিযানে জব্দ করা পাথর ও বালু পরে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স সক্রিয় রয়েছে এবং বিজিবি ও পুলিশের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সরকার সীমিত পরিসরে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে হাতে পাথর উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করছে। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত ২৪ জুন বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে হাতে পাথর উত্তোলনের জন্য কোয়ারিগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি হবে কঠোর তদারকির আওতায় এবং আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামত বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অবৈধ উত্তোলনে সিলেটের পরিবেশগত ভারসাম্য ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, জীববৈচিত্র্য কমে গেছে, পাহাড় ক্ষয় হয়েছে এবং বহু এলাকার প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আবার পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলে পরিবেশ ও পর্যটনের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) সিলেট আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, ‘সিলেটের পাথর কোয়ারি বন্ধ রাখতে উচ্চ আদালতের আদেশ রয়েছে। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত সেই আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।’ 

পরিবেশবাদীদের মতে, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ, নদী-ব্যবস্থা ও পর্যটন শিল্প আরও বড় সংকটে পড়বে।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ: