ছয় মাসে সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কে ১১৭ প্রাণ, দায় শুধু চালকের?
মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩৮ PM

ছয় মাসে সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কে ১১৭ প্রাণ, দায় শুধু চালকের?

শেখ ফয়ছল আহমদ, ওসমানীনগর

প্রকাশিত: ১১/০৮/২০২৬ ০৬:২৩:০৮ PM

ছয় মাসে সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কে ১১৭ প্রাণ, দায় শুধু চালকের?

নিজস্ব


শেরপুর থেকে সিলেট—ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানি। কয়েক দিনের ব্যবধানে ওসমানীনগর ও দক্ষিণ সুরমায় একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনা মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রশ্ন উঠেছে—সড়ক দুর্ঘটনার দায় কি শুধু চালকের? নাকি এর সঙ্গে জড়িত সড়কের অবস্থা, অবৈধ দখল, যানবাহনের ফিটনেস, পরিবহন মালিকদের দায়িত্বহীনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির ঘাটতিও?

হাইওয়ে পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সিলেট অঞ্চলের আওতাধীন মহাসড়কে ১৮৫টি দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত এবং ২৭৫ জন আহত হয়েছেন। তবে এ পরিসংখ্যান শুধু শেরপুর–সিলেট মহাসড়কের নয়; সিলেট অঞ্চলের আওতাধীন মহাসড়কগুলোর সামগ্রিক হিসাব। তবুও সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা শেরপুর–সিলেট অংশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

গত ৭ আগস্ট ওসমানীনগর উপজেলার তাজপুর ইউনিয়নের কাশিকাপন এলাকায় দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার এলাকায় বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। এর আগে ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারের কালা মাহমদ এলাকায় একটি কার ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি ও ঘুমঘুম ভাবকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চালকের পাশাপাশি সড়ক ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার অন্যান্য বিষয়ও তদন্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজারগুলোতে মহাসড়ক দখল, বাড়ছে ঝুঁকি শেরপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন বাজার এলাকায় সড়কের জায়গা দখল করে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্যসামগ্রী, অস্থায়ী স্থাপনা ও যানবাহন রাখার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও কোথাও মহাসড়কের পাশের জায়গা ও ফুটপাত কার্যত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের মূল সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।

এতে বাজার এলাকায় যানবাহন ও পথচারীর চলাচল একই জায়গায় মিশে যাচ্ছে। পণ্য ওঠানামা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও পথচারীদের সড়কে চলাচলের কারণে যানবাহনের গতি ও স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে সংঘর্ষের ঝুঁকি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, মহাসড়কের জায়গা ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি কেন কার্যকরভাবে হচ্ছে না? মহাসড়কের প্রতিটি বাজারে পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা, নির্ধারিত পার্কিং, যাত্রী ওঠানামার স্থান এবং সড়কের নির্ধারিত সীমানা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দুর্ঘটনা কমানো কতটা সম্ভব—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

সওজের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন শেরপুর–নবীগঞ্জ–হবিগঞ্জ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের অবস্থা, খানাখন্দ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, আবার কোথাও পর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো সড়কের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো স্থানে সড়কের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও তা দ্রুত সমাধান না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সড়ক মেরামতের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। তবে সংশ্লিষ্ট সড়কটি একটি পৃথক প্রকল্পের আওতাভুক্ত হওয়ায় প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য ও জবাবদিহির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—সড়কটি যে প্রকল্পের আওতাতেই থাকুক, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? কোনো প্রকল্প চলমান থাকলে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন কাশিকাপনে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনার পর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা বলেন, “আজ আমরা তদন্ত কমিটির সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

দায় শুধু চালকের নয়

সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রায়ই চালকের ভুল, অতিরিক্ত গতি কিংবা বেপরোয়া চালনাকে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়। এসব কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

চালকের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, গাড়ির ফিটনেস, পরিবহন মালিকের দায়িত্ব, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের নকশা, রক্ষণাবেক্ষণ, সড়ক ও ফুটপাত দখল এবং বাজার এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশেষ করে মহাসড়কের বাজারগুলোতে সড়কের জায়গা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্ধারিত স্থান তৈরি এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন শেরপুর–সিলেট মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কাংশ সংস্কার, পর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, বাজার এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং চালকদের কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করেই দায়িত্ব শেষ না করে তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। কোন জায়গায় কী কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, কোন স্থানে কী ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন দরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার কী দায়িত্ব—তা নির্দিষ্ট করে সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করা দরকার।

প্রশ্ন তাই শুধু—দুর্ঘটনা কেন ঘটল?প্রশ্ন আরও বড়—দুর্ঘটনা ঠেকাতে যাদের যার যার দায়িত্ব ছিল, তারা সেই দায়িত্ব কতটা পালন করেছেন?

ছয় মাসে সিলেট অঞ্চলের মহাসড়কে ১১৭ প্রাণহানির তথ্য, সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং মহাসড়কের বিভিন্ন বাজারে দখল ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নইলে শেরপুর–সিলেট মহাসড়ককে নিরাপদ সড়কে পরিণত করার বদলে এটি আরও কত পরিবারের স্বজন হারানোর কারণ হবে।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা