ছবি:সংগৃহীত
সিলেট মহানগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য় আলোচিত ট্রিপল হত্যাকাণ্ডে নিহত প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২) ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের (৭৬) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) আসরের নামাজের পর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ ময়দানে তাঁদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মহানগরীর মানিক পীরের টিলায় তাঁদের দাফন করা হয়।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, নিহত দম্পতির একমাত্র ছেলে আরিফ ইফতেখার যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে শুক্রবার বাদ আসর জানাজায় অংশ নেন। দাফন শেষে তিনি সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করবেন বলে জানা গেছে।
এর আগে শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইটে সিলেটে পৌঁছান আরিফ ইফতেখার। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রায়নগরের নিজ বাসায় গিয়ে মা-বাবার মরদেহের শেষবারের মতো মুখ দেখেন। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) যুক্তরাজ্যপ্রবাসী তাঁর দুই বোনও দেশে পৌঁছান। ময়নাতদন্ত শেষে তাঁদের মরদেহ বাসায় নেওয়া হলে স্বজনরা শেষবারের মতো তাঁদের দেখেন।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা ‘নিকুঞ্জ ভিলা’ থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামে একজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকালে রায়নগরের একটি খালি জায়গা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছোরা উদ্ধার করা হয়। একই দিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুল মিয়ার সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনার পূর্বপরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে তিনি ওই বাসায় যান। সেখানে তাহমিনার সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ছুরি দিয়ে তাঁকে আঘাত করেন। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
পুলিশের দাবি, তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বাসা থেকে পালিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে যান। পরে বিশেষ অভিযানে তাঁকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মিতালী আবাসিক এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলছেন, ঘটনাটি শুধু প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে ঘটেছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের সময়সীমা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র বা কাগজপত্র সরানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, সিসিটিভির সময়ের সঙ্গে পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের কিছু অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ও প্রশ্নের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার মিতালী আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতি ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডবাসী মানববন্ধন করে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
আব্দুস সাত্তারের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার আখাখাজনায়। রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় তিনি প্রবীণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন এবং একসময় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম রায়নগরের মিতালী ১১১ নম্বর ‘নিকুঞ্জ ভিলা’র দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন। তাঁদের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনাও থাকতেন।
তিনজনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এলাকায় এখনও শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। একদিকে পুলিশ আটক বাবুল মিয়াকে কেন্দ্র করে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার পর তদন্তে নতুন কোনো তথ্য বা রহস্য সামনে আসে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




