নিজস্ব
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ(শাকসু)। নামটি যেন ক্যাম্পাসজুড়ে এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক। ২৮ বছর ধরে যে নির্বাচন কেবল আসবে আসবে করেও আর আসে না। শিক্ষার্থীদের বহু আকাঙ্ক্ষিত এই গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম যেন বারবার হাতের নাগালে এসেও অদৃশ্য হয়ে যায়।
সর্বশেষ শাকসু নির্বাচন হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। এরপর প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে ক্যাম্পাস রাজনীতি, কিন্তু শাকসু রয়ে গেছে অনিশ্চয়তার দেয়ালে আটকে। ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মনে নতুন করে আশার আলো জেগেছিল। ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছিল প্রচারণা, আলোচনা, পোস্টার, পরিকল্পনা। অনেকেই মনে করেছিলেন, অবশেষে হয়তো দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই আশার আলো নিভে যায় ভোটের ঠিক আগের দিন।এর আগে নির্বাচনকে ঘিরে নাটকীয়তার শেষ ছিল না। গত ২ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন গঠনের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চার কমিশনার পদত্যাগ করেন। পরে ভোটের আগের দিন, ১৯ জানুয়ারি, বিএনপিপন্থী আটজন শিক্ষকও নির্বাচন কমিশন থেকে সরে দাঁড়ান। পরিস্থিতি তখনই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এর মধ্যে ১৮ জানুয়ারি স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভ শাকসু নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত চার সপ্তাহের জন্য নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দেন। ১৯ জানুয়ারি সেই আদেশ আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ এরই মধ্যে ভোটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছিলেন বহু বছরের কাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য।
কিন্তু একদিনের ব্যবধানে সবকিছু থেমে যায়।অনেক শিক্ষার্থীর ভাষায়, এটি ছিল “মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার” মতো ঘটনা। যেন এক বিশাল অদৃশ্য শক্তি শেষ মুহূর্তে এসে গিলে খেল শাকসুকে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন আয়োজনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।শাকসু নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় এখন ক্যাম্পাসজুড়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক দায় কার?
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাসুদ রানা তুহিন সরাসরি ছাত্রদলকে দায়ী করছেন। তাঁর ভাষ্য, শাকসু বানচালের পেছনে ছাত্রদলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
গত ৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসির কাছে স্মারকলিপি দেন শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা। সেখানে তাঁরা নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্রে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক দাবির পর ঘোষিত শাকসু নির্বাচন একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্থগিত এবং কার্যত বানচাল করা হয়েছে। প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতা, নির্বাচন কমিশনের অস্থিরতা এবং আদালতে রিট দায়েরের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়।
এতে আরও অভিযোগ করা হয়, নির্বাচন কমিশনের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বিত অপতৎপরতা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ব্যাহত করেছে। বিশেষ করে মমিনুর রশিদ শুভ, হাবিবুর রহমান হাসান ও আদনান মোহনসহ কয়েকজনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে মাসুদ রানা তুহিন বলেন, “হাবিব তো রিটকারীদের একজন। আদনান মোহনও রিটকারীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিল। মমিনুর রশিদকেও এখন বিএনপি-ছাত্রদল নেতারাই দেখভাল করছে।”
তিনি আরও বলেন, “এর আগেও কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করেছে, শাকসু স্থগিতের জন্য। রিটকারী আইনজীবীও ছিল বিএনপির।”
এমন অভিযোগের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ফেসবুক গ্রুপেও চলছে তীব্র আলোচনা।
একটি পোস্টে জান্নাতুল মাফি নামের শিক্ষার্থী লেখেন, “শাকসু স্থগিতের জন্য শুভ ভাইয়ের রিটের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বিএনপিপন্থী হেভিওয়েট আইনজীবীবৃন্দ রুহুল কুদ্দুস কাজল, কামরুল ইসলাম সজল, গাজী তৌহিদ, কামরুজ্জামান আসাদ। স্বতন্ত্র প্রার্থীকে টোপ বানিয়ে কারা শাকসু বানচাল করতে চায় বুঝা হয়ে গেছে।”
শিবির-সমর্থিত ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন শিশির বলেন, “তারেক রহমান ছাত্রদলকে দিয়ে মব করিয়ে, রিট করিয়ে জাতীয় নির্বাচনের দোহাই দিয়ে শাকসু নির্বাচন বন্ধ করিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের অমুক-তমুক হিসাবে পরিচয় দেন অথচ নির্বাচিত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত শাকসু নির্বাচন আটকে রেখেছেন কেন?”অন্যদিকে ছাত্রদলও পাল্টা অভিযোগ তুলেছে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে।
গত ৭ মে উপাচার্য বরাবর দেওয়া এক আবেদনে শাবি ছাত্রদল দাবি করে, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কোনো উসকানি ছাড়াই কতিপয় দুষ্কৃতকারী শিক্ষার্থী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সহযোগীরা জোরপূর্বক হল ছাড়তে বাধ্য করে।
আবেদনে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশের ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এদিকে ‘সাস্ট ইনসাইডারস’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে শাহপরান হলের শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে মন্তব্যে তারেক রহমান নামের একজন লেখেন, “স্থানীয় জামায়াত-শিবির ও সাস্টের শিবিরের যৌথ সমন্বয়ে এই কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।” বিভিন্ন পোস্টেও হল থেকে শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ছাত্রশিবিরকে দায়ী করা হয়।
এভাবে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে গভীর বিভাজন। একপক্ষ মনে করছে, ছাত্রদল পরিকল্পিতভাবে শাকসু নির্বাচন ঠেকিয়েছে। অন্যপক্ষের অভিযোগ, ছাত্রশিবির হল থেকে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
জৈন্তাবার্তা/সুলতানা




