হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা, চুরি ও চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে বন বিভাগ।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ কাটা, চুরি ও চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) চুনারুঘাট থানায় মামলাটি করেন সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন। মামলায় ১৯২৭ সালের বন আইন (২০০০ সালে সংশোধিত) এর ২৬(১ক)-এর (খ) ও (ঘ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কেটে নেওয়া হয়। পরে এসব গাছ চুরি ও কেনাবেচা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়াকে। এ ছাড়া উপজেলা যুবদল, শ্রমিকদল ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামও আসামির তালিকায় রয়েছে।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—সিএমসির সভাপতি আবুল খান, উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মিয়া মহলদার, উপজেলা শ্রমিকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর খান এবং উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করিম সরকারসহ আরও কয়েকজন। চুরিকৃত গাছ কেনার অভিযোগেও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে গাছ কাটার অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে মামলা করা হয়েছে।’
চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অপরদিকে একই দিনে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে গাছ কাটা, চুরি ও বিক্রির অভিযোগে আরও ৪২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করেছে বন বিভাগ।
রেমা-কালেঙ্গা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা এইচ এম এরশাদ বাদী হয়ে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) চুনারুঘাট থানায় একই অভিযোগে ৪২ জনের নামে আরেকটি অভিযোগ দায়ের করেন। এই মামলারও বেশিরভাগ আসামি বিএনপি ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।
দুটি মামলায় মোট ৬২ জনকে আসামি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দুটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটা ও পাচারের অভিযোগে এতসংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাতছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশে আমরা এই মামলাটি করেছি। সাতছড়ির ঘটনায় ২০ জনকো আসামি করা হয়েছে। আর রেমা-কালেঙ্গা রেঞ্জের মামলায় ৪২ জনকে আসামি করে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দায়েরের ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বনাঞ্চল থেকে গাছ চুরির প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা হলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।
মামলার অন্যতম আসামি মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সিএমসি সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, মামলায় আমার নাম আসায় তিনি বিস্মিত। গাছ কাটা বা চুরির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বন ধ্বংসের সঙ্গে যারা প্রকৃতপক্ষে জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে নিরপরাধ কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মামলায় আসামি করা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
জৈন্তাবার্তা/আরআর




