ছবি:সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভার লুদুরপুর গ্রামে চাচাতো ভাইয়ের হামলায় নিহত নাজিম উদ্দিনের (৪৫) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গত শনিবার সকালে নিজ বাড়িতে হামলার শিকার হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বিয়ের দাওয়াত নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি বসতভিটা বিক্রি নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তসাপেক্ষ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বাদ আসর লুদুরপুর টার্মিনাল জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নাজিম উদ্দিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ সোমবার বিকেলে স্থানীয় ভবেরবাজারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছেন এলাকাবাসী।
নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা।
নিহতের ছোট বোন সাজিয়া বেগম বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই নাজিমই বাবার মতো ভালোবাসা দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছিল। সেই ভাইকে আমাদের চোখের সামনে কুপিয়ে মেরে ফেলল। আমরা খুনিদের ফাঁসি চাই, দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত নাজিম উদ্দিন লুদুরপুর গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। তাঁর চাচাতো ভাই মাসুম মিয়ার পরিবারের সঙ্গে বসতভিটা বিক্রি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহতের স্বজনদের দাবি, মাসুম মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে নাজিম উদ্দিনকে তাঁর বসতভিটা বিক্রি করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তবে তিনি তাতে রাজি হননি। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ ও মনোমালিন্য চলছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নাজিম উদ্দিনের ছোট বোনের বিয়ে হয়। পরদিন শনিবার বিয়ের পরবর্তী দাওয়াত বা ওলিমা নিয়ে মাসুম মিয়ার সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একপর্যায়ে মাসুমের নেতৃত্বে ৭ থেকে ৮ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নাজিমের বাড়িতে হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে বিয়ের দাওয়াতের বিরোধের সঙ্গে বসতভিটার দ্বন্দ্বের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে নাজিম উদ্দিন বাড়ির বারান্দায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় একদল ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা চালান। হামলায় দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন।
নাজিমের মামাতো ভাই মনসুর মিয়া দাবি করেন, হামলাকারীরা প্রথমে নাজিমের বুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। তিনি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান।
পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহাতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, নাজিম উদ্দিন এলাকার একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি বিএ পাস করার পর এলাকায় পোস্টমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে মুদি ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতেন। এ কারণে স্থানীয় লোকজন তাঁকে ‘নাজিম মাস্টার’ নামে চিনতেন।
আব্দুস সালামের অভিযোগ, বসতভিটা নিয়ে বিরোধের জেরে নাজিমকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে রাখা হয়েছিল। বিয়ের দাওয়াতের বিষয়টি সামনে এনে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
নাজিম দুই ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন।
নিহতের ছোট ভাই বোরহান উদ্দিন বলেন, হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পর প্রধান অভিযুক্ত মাসুম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ দেখা গেছে। ঘটনার পর থেকে ওই পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে নেই বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
জগন্নাথপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত পক্ষের লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এ ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। নাজিম উদ্দিন হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং সুষ্ঠু বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




