পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল হওয়ার এখনই সময়
রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৪:৩২ AM

মাসুদ পারভেজ

পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল হওয়ার এখনই সময়

সম্পাদকীয়

প্রকাশিত: ২৩/০৬/২০২৩ ০৭:৪৩:২১ AM

পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল হওয়ার এখনই সময়

ছবি : সংগৃহীত


গতবছর সিলেটে এক শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় গণমাধ্যমে দেখেছি, কোম্পানীগঞ্জের বর্ণি এলাকায় শিশু, গবাদিপশু ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বসতঘর ছেড়ে যাচ্ছেন আবদুল্লাহ। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ-গোয়াইনঘাট সড়ক প্লাবিত; বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বাড়িঘর। বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে পানিবন্দী মানুষ। পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় তলিয়ে গেছে সিলেট নগরের দুই-তৃতীয়াংশসহ সীমান্তবর্তী এলাকার বাড়িঘর, মহাসড়ক। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। দুর্ভোগে পড়েছে লাখো পানিবন্দী মানুষ। বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কাজ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোস্তাক আহমেদ, তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই সিলেট সুনামগঞ্জে বন্যার ব্যাপকতা বাড়ছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে গাছ এবং পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড়গুলো কিন্তু পানি শোষণ করতে পারতো। পাহাড় কাটার কারণে পানি শোষণ করতে পারছে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এ বন্যার জন্য তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে। সেগুলো হলো জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তঃদেশীয় উদ্যোগের অভাব ও নিজেদের অব্যবস্থাপনা। ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় বেড়েই চলছে। প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। সিলেটের পর্যটন এলাকা ও বিভিন্ন নদীর উৎসমুখ থেকে বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে পরে পানি অপসারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায়ও এ ভয়াবহ বন্যার একটি কারণ বলে অনেকেই মনে করেন। 

সমীক্ষায় মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে আমাদের জিডিপি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা আশা করা হচ্ছে এবং তাতে গড় আয় ২১০০ সাথে ৯০ শতাংশ কম হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। আন্তঃসরকারি প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে ধারণা করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্য প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাৰে।

ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের যেকোনো একটির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পরে । মানুষের অসচেতনতা এবং অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পরছে। পরিবেশ অধঃমানের প্রভাব ব্যাপক এবং গভীর। যার ফলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, সমাজ তথা সার্বিকভাবে সবকিছুই হুমকির সম্মুখীন হয়, যা পরিণামে ধ্বংস-মৃত্যু ডেকে আনে। পৃথিবীতে অনেক নগর সভ্যতা, জাতিগোষ্ঠী পরিবেশ ধ্বংস বা পরিবর্তনের কারণে বিলীন হয়ে গেছে। আর এ পরিবেশ ধ্বংস বা পরিবর্তনের পেছনে মানুষের ভূমিকাই প্রধান।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে কিছু দেশের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পরেছে। অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকির বিষয়ে সচেতন হয়েছে বেশ আগেই। এবার আমাদের পালা। জাতিসংঘের তথ্য মতে, প্রকৃতি ধ্বংসের বর্তমান ধারা চলতে থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন যেভাবে হচ্ছে তা যদি চলতে থাকে তাহলে ২০৭০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রতি তিনটির মধ্যে একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। গত ৫০ বছরে গড়ে ৬০ শতাংশের বেশি বন্যপ্রাণী হ্রাস পেয়েছে। সে হিসেবে গত ১০ মিলিয়ন বছরের তুলনায় বর্তমানে প্রজাতি বিলুপ্তির গড় হার ১০ থেকে ১০০ গুণ বেশি। পৃথিবীব্যাপী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভগুলো মনুষ্য কর্মকাণ্ডে অস্বাভাবিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ ভূ-ভাগে মানুষ ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন করেছে। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক প্রতিবেশ আজ পরিবেশগত হুমকীর সম্মুখীন। ২০১০ হতে ২০১৫ সালের মধ্যে ৩২ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। আমরা যদি পরিবেশগত এ অবক্ষয় রোধ করতে না পারি তাহলে ব্যাপকভাবে জীববৈচিত্র্য এবং প্রতিবেশ ধ্বংসের কারণে মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। গণমাধ্যম জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রধানতম হাতিয়ার। সেজন্য এ মাধ্যমকে সঠিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। 

গ্লাসগো জলবায়ু চুক্তি অনুসরণ বিষয়ক এক প্রবন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে ০.৫৬ শতাংশ অবদান রাখে, তবু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশের ক্ষতির অনুপাত অপ্রতিরোধ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ক্ষয়, খরা, তাপ এবং বন্যা-সবই আমাদের অবকাঠামো এবং কৃষিশিল্পকে ধ্বংস করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো মোকাবিলা করার জন্য আমরা মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনাও উন্মোচন করেছি, আমাদের শক্তি নেটওয়ার্ককে ডিকার্বনাইজ করা থেকে শুরু করে সবুজ বিনিয়োগের উদ্যোগ বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে উভয় ক্ষেত্রে আমাদের গতিপথকে ক্ষতিকর প্রভাবের পরিবর্তে সমৃদ্ধিশালী করবে। আমরা 'বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গ্রহণ করেছি: যার লক্ষ্য একটি নিরাপদ, জলবায়ু সহনশীল এবং সমৃদ্ধ বদ্বীপ গঠন করা। প্রতিবছর আমার দল আমাদের দেশের গাছের পরিধি বাড়াতে লাখ লাখ চারা রোপণ করে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) এবং ভি-২০-এর সাবেক চেয়ার হিসাবে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থের প্রচারে মনোনিবেশ করে চলেছে। 

পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে ব্যক্তিভিত্তিক সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন জনসচেতনতা। মানুষের লাগামহীন দূষণমূলক কর্মের ফলে প্রকৃতি দিন দিন ভয়ানক রূপ ধারণ করছে। কল-কারখানার নির্গত বর্জ্য এবং জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগের ফলে পানি দূষণে জলজ প্রাণী ও প্রতিবেশ ধ্বংস হচ্ছে।  পাশাপাশি বায়ু ও শব্দদূষণের ফলে স্থলজ উদ্ভিদ-প্রাণীকুলসহ প্রতিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি ও এইচএফসি বা হাইড্রোফ্লোরোকার্বন ব্যবহার করে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে ওজন স্তর ধ্বংস করা হচ্ছে। আর পরিমন্ডলের এ সমস্ত কিছু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অসচেতনতা এবং অপরিকল্পিত পরিকল্পনা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। প্লাস্টিক সামগ্রী পরিবেশকে দূষণ করে জলজ, স্থলজ, বনজ এমনকি মানবজাতির স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পলিথিন ব্যাগ, গৃহস্থালির ব্যবহৃত প্লাস্টিক, পণ্যের মোড়ক, কসমেটিক্স প্লাস্টিক, পানির জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতলের ব্যাপক ব্যবহার প্রকৃতিকে দূষিত করছে। প্লাস্টিক এমন একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা সহজে পচে না এবং যার পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে প্রচুর সময় লাগে। ফলে পরিবেশের ওপর এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক অপচ্য পদার্থ হওয়ায় বন, জল ও স্থলের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রাণীর বাসস্থান ও খাদ্য গ্রহণে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করছে। এতে করে প্রাণীসহ প্রতিবেশের অন্যদেরও জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

সময় এসেছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নে প্রকৃতির সৃষ্ট পরিবর্তন ও তা থেকে উত্তরণের করণীয় সম্পর্কে জানানোর; প্রকৃতির ক্ষতি করে সুন্দর জীবনধারণ কখনোই সম্ভব নয়। কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করে সার্বিক বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমকে  বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে দারিদ্র্যবিমোচন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি থেকে দেশকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে বৃক্ষরোপণ ও বনজ সম্পদকে রক্ষা করে বায়ুদূষণের মাত্রা কমাতে হবে। বাস্তুতন্ত্রের যেসব জীব পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, তাদের সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সবুজ,পরিচ্ছন্ন,পরিবেশবান্ধব, বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়তে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এমনকি ব্যক্তিগত সতর্কতা এ সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পরিবেশের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মানুষসহ সব প্রাণের অস্তিত্ব পরিবেশের ওপরই নির্ভরশীল। কারণ পরিবেশই প্রাণের ধারক ও বাহক। তাই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ প্রাণের অস্তিত্বের পক্ষে হুমকি। মানুষ যেমন তার প্রয়োজনে পরিবেশকে নিজের উপযোগী করছে, ঠিক তেমনি সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিতে মানুষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে প্রাণের অস্তিত্ব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অসচেতনতা এবং অপরিকল্পিত পরিকল্পনা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণ করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। কারণ পরিবেশ সংকটের এই দায় সমগ্র মানবজাতির।

-মাসুদ পারভেজ


জৈন্তাবার্তা/এমকে