৪০ কোটি টাকার ঋণ জটিলতায় বিপর্যস্ত টি-কোম্পানি
রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১০:০৮ PM

আন্দোলনের ঘোষণা শ্রমিকদের

৪০ কোটি টাকার ঋণ জটিলতায় বিপর্যস্ত টি-কোম্পানি

জালাল উদ্দিন লস্কর ,মাধবপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৪/০৫/২০২৬ ০৮:৪৬:০৬ PM

৪০ কোটি টাকার ঋণ জটিলতায় বিপর্যস্ত টি-কোম্পানি

ছবি:সংগৃহীত


বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণ প্রদান নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও টালবাহানার কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে দেউন্দি টি কোম্পানি। এতে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি, স্টাফদের বেতন-ভাতা, ঈদ বোনাস, পূজা উৎসব ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষ। বকেয়া মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে সোমবার (২৫ মে) থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য চা বাগান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকরা।

জানা গেছে, দেশের চা শিল্প বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণ জটিলতায় দেউন্দি টি কোম্পানির আওতাধীন হবিগঞ্জ জেলার লালচান্দ, নোয়াপাড়া ও দেউন্দি চা বাগান এবং মৌলভীবাজার জেলার মিরথিংগা চা বাগানে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বাগান সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ভোরে লালচান্দ চা বাগানে বিদ্যুৎ শর্ট সার্কিট থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে চা কারখানার যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও গুদামে থাকা বিপুল পরিমাণ চা পাতা পুড়ে যায়। এতে প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গভীর রাতে কোম্পানির ১৩টি বড় ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যায়। এতে আরও প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ অবস্থায় দেউন্দি টি কোম্পানি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কাছে ৪০ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ৩৭ কোটি টাকা অনুমোদন দিলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধাপে ধাপে ২৫ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। তবে বাকি ১২ কোটি টাকা এপ্রিল মাসে ছাড় দেওয়ার কথা থাকলেও মে মাসের শেষ দিকে এসেও তা প্রদান করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কোম্পানিটি কার্যক্রম পরিচালনায় চরম সংকটে পড়েছে।

নোয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক সহকারী সোহাগ মাহমুদ বলেন, ‘যখন চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা, তখন কৃষি ব্যাংক ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিয়েছে। অথচ বর্তমানে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা ৪২ পয়সা হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু চা পাতার দাম বাড়েনি। এখন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঋণ দিতে টালবাহানা করায় বাগান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘চা শ্রমিকদের চাপ দিন দিন বাড়ছে। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।’

দেউন্দি টি কোম্পানির আওতাধীন বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিকরা বকেয়া মজুরি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই জানান, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সামান্য মজুরি দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর নিয়মিত মজুরি না পাওয়ায় সন্তানদের লেখাপড়া ও পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লালচান্দ চা বাগানের ব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক নিয়মিত দেউন্দি টি কোম্পানিকে ঋণ দিয়ে আসছিল। হঠাৎ করে ঋণ বন্ধ করে দেওয়ায় বাগান পরিচালনায় ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। ৩৭ কোটি টাকা অনুমোদনের পরও বাকি ১২ কোটি টাকা ছাড় না দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।’

তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রাপ্ত ২৫ কোটি টাকা দিয়ে শ্রমিক ও স্টাফদের বকেয়া বেতন-ভাতা, ঈদ বোনাস, পূজা উৎসব ভাতা, ঔষধ ক্রয়, চিকিৎসা ব্যয়, ভবিষ্যৎ তহবিল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এরপরও প্রায় ১৫ কোটি টাকার দায় রয়ে গেছে।

গত ২২ মে নোয়াপাড়া চা বাগানের দুর্গামণ্ডপে বাগান সভাপতি বাবু কমেট নায়েকের সভাপতিত্বে এক জরুরি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারি, সর্দার, নারী-পুরুষ শ্রমিক, ইউপি সদস্য ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সভায় শ্রমিক নেতারা বলেন, ‘গত সপ্তাহের মজুরি এখনো দেওয়া হয়নি। পেটের ক্ষুধা নিয়ে বাগানে কাজ করা সম্ভব নয়। আজকের (রবিবার) মধ্যে বকেয়া মজুরি পরিশোধ না হলে সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য চা বাগান বন্ধ থাকবে।’

চা সংসদের কয়েকজন সদস্য জানান, চা বাগান পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চলমান জটিলতায় দেউন্দি টি কোম্পানি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দ্রুত বাকি ঋণ ছাড় না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ