ছবি : সংগৃহীত
সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক। ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে এবং জলাবদ্ধতার কারণে আধাপাকা ও পাকা ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষকদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
হাওরজুড়ে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে কৃষকদের কষ্টের ফসল। কিভাবে সংসার চালাবেন আর ঋণ পরিশোধ করবেন; তা নিয়ে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন লাখো কৃষক। কেউ কেউ ডুবেচুবে ধান কাটলেও আশার আলো দেখছেন না।
কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তলিয়ে আছে অষ্টগ্রাম হাওরের অন্তত দেড় হাজার হেক্টর বোরো জমি। এখনো অনবরত নদী উপচে পানি ঢুকছে হাওরে। গত দুইদিনের বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা বন্ধ পুরো হাওরে। এখন কোমর-সমান পানি। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে এসব ধান না কাটলে সব পচে নষ্ট হবে।
জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান। চোখের সামনে এসব পাকা-আধা পাকা ধানক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে নেমেছে হাহাকার। এখনো উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল নামছে। এতে হাওর ও নদীতে পানি বেড়ে তলিয়ে যাচ্ছে জমির ধান। ডুবে যাওয়া জমি থেকে ধান তোলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন জেলার অন্তত আট-নয় লাখ কৃষক।
সুনামগঞ্জে সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। পানির চাপে দুই উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবে গেছে। বুধবারও জেলার বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জে হাওরের ৪৪ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো আবাদের অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা এখনো বাকি। এরই মধ্যে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে। যার পরিমাণ ১০ হাজার হেক্টরের বেশি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছোট-বড় ২০টি হাওর তলিয়ে গেছে। এসব হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ভারতীয় ঢলে এসব ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। এখনো তলিয়ে যাচ্ছে। হাওরের পানি ও নদীর পানি সমান্তরালে প্রবাহিত হওয়ায় নিষ্কাশনের কোনো সুযোগ নেই। গত দুদিন পানির মধ্যে ধান কাটলেও আজ কাটারও কোনো অবস্থা নেই।
শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার কৃষকরা জানিয়েছেন, জমির ফসল ডুবে যায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। হাওরে পানির চাপ, বজ্রপাত আতঙ্কের মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকটসহ নানা কারণে সংকট গভীর তৈরি হয়েছে। সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের জমির ধান তলিয়ে গেছে। আবার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকের শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে।
জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। জেলায় এ পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। সবমিলিয়ে হাওর ও নন হাওরে ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। হাওরে বোরো ধান কাটায় এখন কৃষকরা হারভেস্টর মেশিনের ওপর বেশি নির্ভর করেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাওরে পানি থাকায় অনেক স্থানে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। শিলাবৃষ্টিতে ৫৩৮ হেক্টর ও জলাবদ্ধতায় ১ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না নামলে আরো কিছু জমির ধান পচে নষ্ট হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার জন্য। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবারও সুনামগঞ্জে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হওয়ায় নামছে উজানের পাহাড়ি ঢল। এতে হাওরে ও নদীতে দ্রুত পানি বাড়ছে। চোখের সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের জমির ধান।
এদিকে, হবিগঞ্জের চার উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার একর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। যারা জমি থেকে ফসল কাটতে পেরেছেন, তাদের ধানও মাঠে ভিজছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা। এ অবস্থায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় হাজার হাজার কৃষক অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা সরকারি সহায়তা দাবি করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, ‘টানা বৃষ্টির আশঙ্কা থেকে কৃষকদের আগেই সতর্ক করে পাকা ধান দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। গত কয়েকদিনে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে আমাদের মাঠের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’
জানা যায়, বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীর পানিও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই পানি হাওরে প্রবেশ করে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। চারটি উপজেলায় যে ফসল তলিয়েছে সেখানে ১০-১২টি হাওর রয়েছে। টানা বৃষ্টিপাত এবং পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেননি। এমনকি খলায় থাকা ধানও তোলা যায়নি গোলায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ডুবে যাওয়া জমি থেকে ধান উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেককে পানির নিচ থেকে ধান কেটে তুলতে দেখা যায়। এতে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে অন্তত এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জেলাজুড়ে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মূলত পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া ও বালিয়াছড়ার বাঁধ ভেঙে জেলার প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এর মধ্যে জুড়ী উপজেলার শাহপুর ও আশপাশের এলাকায় ঢলের পানিতে প্রায় ৩,৫০০ বিঘা (প্রায় ৪৬৬ হেক্টর) আধা পাকা বোরো ধানক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া ও জুড়ী অংশের এলাকায় অন্তত ১৯০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে যাওয়া খবর পাওয়া গেছে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, গত তিনদিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে আগাম বন্যার মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এতে হাওরের পাশাপাশি জেলার হাওর এলাকার বাইরে নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। পাকা ধান ঘরে তুলতে না পারায় অনেক কৃষক চরম হতাশায় পড়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায়। হাওরের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে, বাকিটা হাওর এলাকার বাইরে রয়েছে। তবে ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেশি নয়।
কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার কেওলার হাওরে প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইভাবে রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের ধানক্ষেত প্লাবিত হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সবমিলিয়ে ৮৯৭ হেক্টর ফসল পানিতে ডুবেছে। তবে তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। হাওরে ধানা কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। সামান্য ধান কাটার বাকি রয়ে গেছে। আশা করি বৃষ্টি কমলেই ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।’
জৈন্তা বার্তা/আরআর




