মেয়ে বলে স্বপ্ন থামবে কেন, কন্যাশিশুর সমান অধিকারের দাবি
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন

মেয়ে বলে স্বপ্ন থামবে কেন, কন্যাশিশুর সমান অধিকারের দাবি

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১/১০/২০২৬ ০৯:২০:৩০ পূর্বাহ্ন

মেয়ে বলে স্বপ্ন থামবে কেন, কন্যাশিশুর সমান অধিকারের দাবি

সংগৃহীত


একটি শিশুর চোখে যখন স্বপ্নেরা ডানা মেলে, তখন সেখানে ছেলে কিংবা মেয়ে বলে কোনো ভেদাভেদ থাকার কথা নয়। প্রতিটি শিশুরই অধিকার আছে নিজের মতো করে বড় হওয়ার, আকাশ ছোঁয়ার, পৃথিবীকে নতুন করে দেখার। অথচ বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে আজও বহু কন্যাশিশুর স্বপ্ন থমকে যায়। কারও হাতে বইয়ের বদলে তুলে দেওয়া হয় সংসারের বোঝা, কারও শৈশব কেড়ে নেয় বাল্যবিয়ের নির্মমতা, আবার কেউ জন্মের পর থেকেই বৈষম্যের শিকার হয় শুধু মেয়ে হয়ে পৃথিবীতে আসার কারণে। সেই অন্ধকার ভেদ করে কন্যাশিশুর অধিকার, মর্যাদা ও সম্ভাবনার কথা নতুন করে মনে করিয়ে দিতেই প্রতিবছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস।

আজ ১১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের জন্য বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে। ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য- কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা, তাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা এবং তাদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করা। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করুন, কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ করুন।’একটি কন্যাশিশু মানে শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়; সে একটি সমাজের সম্ভাবনা, একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তার হাতে বই তুলে দেওয়া মানে একটি প্রজন্মকে আলোকিত করা, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া মানে আগামী দিনের নেতৃত্বকে সম্মান জানানো। অথচ শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ- জীবনের নানা ক্ষেত্রেই বিশ্বের অসংখ্য কন্যাশিশুকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি এবং অনলাইন সহিংসতা তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার অগ্রগতি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মধ্যেও বাল্যবিয়ে, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পুষ্টির ঘাটতি ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মতো সমস্যা এখনও উদ্বেগের কারণ। কোনো কিশোরীর যখন স্কুলে যাওয়ার কথা, তখন তার কাঁধে সংসারের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া কিংবা অল্প বয়সে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করা শুধু তার ব্যক্তিগত স্বপ্নকেই থামিয়ে দেয় না, বাধাগ্রস্ত করে একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাও।একটি মেয়ের শৈশব যেন কোনোভাবেই ভয়ের কাছে পরাজিত না হয়। তার পথচলা যেন থেমে না যায় লোকলজ্জা, দারিদ্র্য কিংবা বৈষম্যের দেয়ালে। সে যেন নির্ভয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, পছন্দের পেশা বেছে নিতে পারে এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে- এটাই হওয়া উচিত পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান ছেলে হোক কিংবা মেয়ে- দুজনের স্বপ্ন দেখার অধিকার সমান। মেয়েকে বোঝা নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। তার আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

কন্যাশিশুর সুরক্ষা শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল এবং ডিজিটাল জগতে সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বাল্যবিয়ে বন্ধে পরিবার ও সমাজকে সচেতন করার পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার শিশুদের জন্য সহজলভ্য সহায়তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস তাই কেবল পালনের দিন নয়, আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারেরও দিন। আজকের কন্যাশিশুটিই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তার স্বপ্নকে ছোট করে দেখার অর্থ একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে সংকুচিত করা।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা



শীর্ষ সংবাদ: