ছবি: জৈন্তা বার্তা
স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন- এমন চিন্তা থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন হারিছ উদ্দিন আফরাজ। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর কী মনে করে তিনি দেশে ফিরে এলেন। ‘লন্ডনি’ হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দেশেই কিছু একটা করার চিন্তা পেয়ে বসল তাকে। ভাবলেন, ব্যবসা করে উপার্জন করে সংসার চালাবেন। কিন্তু ব্যবসায় চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে সব পুঁজি হারিয়ে বসলেন হারিছ। তবে শেষ পর্যন্ত গরুর খামারে কপাল খুলল তাঁর। আজ দেশে বসে তিনি যা উপার্জন করেন, তা লন্ডনের চেয়ে কম নয়।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর এলাকার হবিবপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা হারিছ উদ্দিন। এই উপজেলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ প্রবাসী। অধিকাংশই থাকেন যুক্তরাজ্যে। স্থানীয়ভাবে তাঁদের বলা হয় ‘লন্ডনি’। সিলেট অঞ্চলে এই লন্ডনিদের কদর খুব বেশি।
হারিছকেও লন্ডনি বানানোর স্বপ্নে বিভোর ছিল তাঁর পরিবার। ২০০৮ সালে তিনি সিলেট এমসি কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিএ পাস করেন। ২০১০ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। স্বপ্নের লন্ডনে পৌঁছালেও অনুভ‚তি অতটা সুখকর ছিল না। জীবিকার প্রয়োজনে অন্যদের মতো হারিছকেও পড়াশোনার ফাঁকে রেস্তোরাঁয় শ্রমিকের কাজ করতে হতো। এভাবেই ভিক্টোরিয়া ইংলিশ কলেজ থেকে তিনি এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
হারিছ উদ্দিন বলেন, এলাকার আর দশটি পরিবারের মতো আমার মা-বাবারও স্বপ্ন ছিল ছেলে লন্ডনি হবে। আমি ইচ্ছা করলে লন্ডনি মেয়ে বিয়ে করে সেখানে স্থায়ী হতে পারতাম। এমন সুযোগ পেয়েছিলামও। কিন্তু আমার মন বারবার বলছিল দেশে এসে কিছু করি। তাই স্বপ্নের লন্ডন ছেড়ে চলে আসি।
এমবিএ ডিগ্রির সনদ ঘরে ফেলে রেখে পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন হারিছ। লন্ডন থেকে বহু কষ্টে উপার্জন করে আনা সব অর্থ দিয়ে দুটি বাস ও দুটি মাইক্রোবাস কেনেন। আশা ছিল এই ব্যবসার আয় দিয়ে সংসার চলবে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে পরিবহন ব্যবসায় লোকসান গুনতে হয়। শেষ সম্বল পুঁজি হারিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।
প্রথম দফার চেষ্টায় হোঁচট খেলেও হাল ছাড়েননি হারিছ। বাবার ছিল চারটি দেশি জাতের গরু। বাবাকে বুঝিয়ে সেগুলো ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। সেই টাকা দিয়ে নরসিংদী থেকে অস্ট্রেলিয়ান জাতের একটি গাভী কিনেন। এক মাস পর গাভিটি বাচ্চা দেয়। দিনে ২০ লিটার দুধ দিতে শুরু করে। পরিবারের চাহিদা মেটানোর পরও অনেক দুধ বিক্রি করা যায়। দিনে দিনে দুধ বিক্রির টাকা জমতে থাকে। ২০১৬ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় আরেকটি বিদেশি জাতের গাভী কিনেন। ২০১৭ সালে কিনেন আরেকটি। গাভী বাচ্চা দিতে শুরু করে। এভাবে বাড়তে থাকে খামারের পরিধি। বর্তমানে হারিছের খামারে ১৫টি গাভী রয়েছে।
সোমবার সরেজমিনে হারিছ উদ্দিনের খামার ঘুরে দেখা যায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে খাবার তৈরি ও খাওয়ানোর কাজ নিজ হাতে করেন তিনি। এসব কাজে তাঁকে সহায়তা করেন দুই শ্রমিক। এ ছাড়া সময়-সুযোগমতো হারিছের বৃদ্ধ বাবা সফিজুর রহমানও তাঁকে সহায়তা করেন।
সফিজুর রহমান বলেন, ছেলে লন্ডন থেকে দেশে চলে আসার পর প্রথমে আমাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়। এখন আর সেই কষ্ট নেই। দেশে বসেই হারিছ লন্ডনের সমপরিমাণ আয় করছে। আমরা সবাই মিলে এখন অনেক ভালো আছি।
কাজের ফাঁকে হারিছ তাঁর সফলতার পেছনের গল্প শোনালেন। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা গরুর বড় বড় খামার পরিদর্শন করেছেন। এসব খামার থেকে হাতে-কলমে কাজ শিখে নিয়েছেন। সফলভাবে খামার পরিচালনার জন্য দরকারি বিভিন্ন পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে কোন ধরনের গাভীকে কী খাবার দিতে হবে, অসুস্থ হলে কী করতে হবে- সব রপ্ত করে নিয়েছেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সফলতা পেয়েছেন। এখন হারিছের খামারে প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। দুধ বিক্রি হয় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার। সে হিসেবে গড়ে প্রতি মাসে আয় হয় অন্তত ৫০ হাজার টাকা।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন বলেন, অত্যন্ত পরিশ্রমী যুবক হারিছ। খামারের আয় দিয়ে তিনি জগন্নাথপুর বাজারে দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করেছেন। পাঁচজনের সংসার চালাচ্ছেন। মা-বাবা ও দুই ভাইকে নিয়ে হারিছের সংসার। ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ তিনিই চালাচ্ছেন। সব মিলিয়ে এলাকার একজন সফল উদ্যোক্তা ও খামারি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন হারিছ। তাঁকে অনুসরণ করে এলাকার অনেকেই গরুর খামার গড়ে তুলে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে রয়েছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ইচ্ছা করলে দেশে বসেই অনেক কিছু করা যায়, তা প্রমাণ করেছেন হারিছ। তাঁর মতো শিক্ষিত যুবকেরা সমাজে অনুকরণীয়। আমি সবসময় তাঁর খামার পরিদর্শন করে খোঁজ-খবর নিই। তাঁর সফলতায় আমরা মুগ্ধ।
-
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




